জনবিচ্ছিন্ন কোনো শাসনের প্রথম বৈশিষ্ট্যই হলো ভিন্নমতকে সরাসরি মোকাবিলা না করে তাকে নানা বিশেষণে আটকে ফেলা। তারা সমালোচককে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে, তার সমর্থনভিত্তিকে আলাদা করে দেয় এবং মূল অভিযোগকে গুরুত্বহীন করতে চায়। বর্তমানে পাকিস্তানে এ পদ্ধতিই ক্ষতিকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
সেখানে বিদেশি আধিপত্য বিস্তারের যুদ্ধের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে স্রেফ ‘সাম্প্রদায়িক গোলযোগ’ হয়েছে বলে তকমা দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের অনুগত একটি নিরাপত্তা রাষ্ট্র নিজেকে এখন জাতীয় শৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান হিসেবে হাজির করতে চাইছে।
শিয়া আলেমদের কাছে পাকিস্তানের শাসকদের দেওয়া বার্তাটি ছিল চরম নিষ্ঠুর। তাঁদের বলা হয়েছে, ‘ইরানকে যদি এতই ভালো লাগে, তবে ইরানে চলে যান।’ এটি কোনো শক্তির ভাষা নয়। এটি আসলে একটি ভিতু ও অনুগত শাসকগোষ্ঠীর দুর্বল অভিব্যক্তি। যারা মূলত ইরান ইস্যুতে মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নিতে চরম ব্যর্থ হয়ে ভিন্নমতকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করছে এবং মানুষের মধ্যে ভীতি ও অপবাদের পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে।
এখানে আসল প্রশ্নটি ধর্মীয় বা তাত্ত্বিক নয়, প্রশ্নটি ক্ষমতার। পাকিস্তান কে শাসন করছে, কার স্বার্থে শাসন চলছে এবং পাকিস্তান কার ছায়ায় টিকে আছে?
পাকিস্তানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী খুব ভালো করেই বোঝে যে তারা শুধু একটি সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক সংকটের মুখে নেই। তারা এমন কিছুর মুখোমুখি, যা তাদের অস্তিত্বের জন্য অনেক বেশি বিপজ্জনক। সেই বিপদ হলো, পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ নিজেদের ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে বুঝতে পারছে যে তাদের দেশ এখন পরাধীনতার জালে বন্দী। তারা এখন বাইরের দেশের স্বার্থ রক্ষা এবং ভেতরকার ভীরুতাকে সাহসের আবরণে দেখতে শুরু করেছে।
করাচির মার্কিন কনস্যুলেটের বাইরে ঘটে যাওয়া সেই হত্যাকাণ্ড কেন এত তাৎপর্যপূর্ণ? যখন পাকিস্তানের মাটিতেই মার্কিনদের গুলিতে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভকারীরা মারা যান, তখন রাষ্ট্রীয় সব অজুহাত মিথ্যা হয়ে যায়।
যখন বাইরের দেশের সহিংসতা এবং দেশের ভেতরকার দমন-পীড়ন একই বিন্দুতে মিলে যায়, তখনই রাষ্ট্রযন্ত্রের আসল চেহারা উন্মোচিত হয়। বিদেশের আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার বদলে বরং দেশের ভেতরে মানুষের ক্ষোভকে দমন করা পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রধান কাজে পরিণত হয়েছে।
এই দমনের জন্য তারা মতাদর্শিক কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। কারণ, যেকোনো বিক্ষোভ আটকে দেওয়া গেলেও রাজনীতিকে সহজে আটকানো যায় না। রাজনীতি আমাদের চেনার সুযোগ দেয়—কারা কাঠামোর সুফল ভোগ করছে। রাজনীতি প্রশ্ন তোলে, কেন দেশটি জনসভায় সার্বভৌমত্বের দোহাই দিলেও ওয়াশিংটনের সামনে এতটা নরম হয়ে থাকে? কেন তারাই আবার নিজ নাগরিকদের ওপর এতটা নির্মম হয়ে ওঠে? রাজনীতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে যাঁরা জাতির অভিভাবক সাজেন, তাঁরা বাস্তবে অন্যের আজ্ঞাবহ এক কারারক্ষীমাত্র।
ইরানের বিপ্লব কেন বিশ্বের বহু দেশের শাসক ও সামরিক আজ্ঞাবহদের আতঙ্কিত করেছিল? কারণ, সেটি কেবল নির্দিষ্ট মতাদর্শের বিজয় ছিল না, বরং তা ছিল বিদেশি শক্তির সমর্থনে টিকে থাকা এক শাসকের পতন। সেই বিপ্লব প্রমাণ করেছিল যে দেশের মানুষ চাইলে সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে নিতে পারে।
ঠিক এ কারণেই তারা আতঙ্কে রাজনৈতিক সেই লড়াইকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে প্রচার করতে থাকে। একটি সার্বভৌম রাজনৈতিক আন্দোলনকে তাত্ত্বিক পথভ্রষ্টতা বলে রটনা করে দেয়। এটি একটি ভয়াবহ জোচ্চুরি হলেও দীর্ঘকাল ধরে এ কাজই করা হচ্ছে। কারণ, রাষ্ট্র ও তাদের প্রচারণাযন্ত্র দিনরাত মানুষের মগজে এই বিষ ঢোকায়।